স্বপ্নের ইউরোপ আসতে লক্ষ টাকা খরচ করে ও মানবেতর কাটছে জীবন জঙ্গলে

ইমরান আলী
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২০ মার্চ, ২০২১
  • ৯৬ বার পঠিত

স্বপ্নের ইউরোপ যেতে প্রতারণার শিকার হয়ে হাজার হাজার বাঙালি বসনিয়া ও গ্রিসের জঙ্গলে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। পথে পথে ভয়ংকর ঝুঁকি নিয়ে ক্রোয়েশিয়া ও স্লোভেনিয়ার জঙ্গলে থেকে তারা চেষ্টা করছেন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাড়ি দেওয়ার। কিন্তু ক্রোয়েশিয়া পুলিশের বাধা ও নির্যাতনে তারা আবারো ফিরে যাচ্ছেন জঙ্গলে। আর এই জঙ্গলই এখন ঠিকানা হয়ে দাঁড়িয়েছে এসব বাংলাদেশির।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চীনের বাংলাদেশি দূতাবাস থেকে আলবেনিয়ায় কাজের জন্য বাংলাদেশিদের ভিসা দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের কয়েকটি রিক্রুটিং এজেন্ট ৮ লাখ টাকার বিনিময়ে তাদের আলবেনিয়া বিএমইটির ছাড়পত্র নিয়েই বৈধভাবে আলবেনিয়া গেছেন। কিন্তু সেখানে যে কোম্পানির কাজ দেওয়ার কথা ছিল তা তারা পাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে দালালদের মাধ্যমে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টা করছেন।

সূত্র জানায়, আলবেনিয়া পর্যন্ত তাদের বৈধতা থাকলেও সেখানে কাজ না থাকায় তারা অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। ইউরোপের সব দেশেই যাওয়ার প্রতিটি পথ ভয়ংকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাহাড় ও জঙ্গল পেরিয়ে বসনিয়ার জঙ্গলে আশ্রয় নিচ্ছেন তারা। এখন বসনিয়া থেকে ক্রোয়েশিয়া ও স্লোভেনিয়া হয়ে গ্রিস অথবা চেক রিপাবলিক, ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করছেন। জানা গেছে, গত এক বছরে ১৩ হাজার বাংলাদেশিকে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। আর বৈধ পথে আলবেনিয়া গেছে এক বছরে ৫৮ জন। আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য আবেদনও করেছে। ভুক্তভোগী সাব্বির আহমেদ সাজু জানান, তিনি বিসমিল্লাহ রিক্রুটিং এজেন্টের মাধ্যমে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু তার দুই বন্ধু সেখান থেকে তাদের দুরবস্থার কথা জানালে তিনি আর যেতে রাজি হননি। তিনি অভিযোগ করেন, তিনি যাওয়ার জন্য ৮ লাখ টাকা দিয়েছেন। এখন তিনি যেতে চান না, এ কারণে সেখান থেকে তাকে টাকাও ফেরত দেওয়া হয়নি। বিএমইটির মহাপরিচালক শামসুল আলম বলেন, আলবেনিয়ায় আমাদের কোনো অ্যাটাচে নেই। কর্মী যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তারা যে কাজ পাচ্ছে না কিংবা অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করছে, সেই বিষয়টি সম্পর্কে তারা জানেন না।

ব্র্যাকের অভিবাসী বিষয়ক প্রোগ্রামের প্রধান সমন্বয়ক শরিফুল হাসান বলেন, আসলে ওই দেশে যে কোম্পানির নামে ভিসা আসছে, সেগুলো ভালো করে যাচাই-বাছাই না করে লোক পাঠানোর কারণে এই অবস্থা হচ্ছে।

তিনি বলেন, চীনে গিয়েই ভিসা নিতে হচ্ছে। সেহেতু দূতাবাসের ভালোভাবে খোঁজখবর নেওয়াটা জরুরি। যখন লোকজন ওখানে গিয়ে কাজ পাচ্ছে না, তখন তারা বাধ্য হয়ে ইউরোপ প্রবেশের চেষ্টা করছে।

অবৈধভাবে ইউরোপের রুট : বিভিন্ন তথ্যউপাত্ত থেকে জানা যায়, বাংলাদেশিরা মূলত ইউরোপে যাওয়ার জন্য ভূমধ্যসাগর বা সেন্ট্রাল মেডিটেরিয়ান রুটই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে। এই রুটে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি গেছেন ২০১৭ সালে, ৯ হাজার। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে এই প্রবণতা বেশ কমে এলেও চলতি বছর আবার এই পথে লোকজন ইউরোপে ঢোকার চেষ্টা করছে। গতবছর যেখানে এই পথে ৬৯১ জন বাংলাদেশি এসেছে এ বছরের জুলাই পর্যন্ত সেখানে আড়াই হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি প্রবেশ করেছেন।

বসনিয়ার জঙ্গলে থাকা বাংলাদেশি অভিবাসীরা মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। গত সেপ্টেম্বরে রয়টার্সের প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর ক্রোয়েশিয়ার সীমান্তবর্তী শহর ভেলিকা ক্লাদুসার জঙ্গলে আটকেপড়া বাংলাদেশিদের দুর্দশার কথা দেশটির বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে আসে। মূলত ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত কোনো দেশের সীমানায় প্রবেশের জন্য তারা সেখানে অবস্থান নিয়েছিলেন।

তাদের অনেকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ক্রোয়েশিয়া হয়ে স্লোভেনিয়া এবং সেখান থেকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য দেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু স্লোভেনিয়া ও ক্রোয়েশিয়ার পুলিশের তৎপরতার কারণে তাদেরকে বাধ্য হয়ে আবার বসনিয়ায় ফিরে আসতে হয়েছে।

ভেলিকা ক্লাদুসার শরণার্থী শিবিরে আটকেপড়া বাংলাদেশিসহ অন্যান্য দেশের অধিবাসীদের জন্য ঠান্ডা গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথমত এসব শরণার্থী শিবিরে যেখানে জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিস পাওয়াটা অনেকটা দুষ্কর, সেখানে ঠান্ডা নিবারণের জন্য যথার্থ প্রস্তুতির চিন্তা করা আকাশ কুসুম কল্পনা বৈ অন্য কিছু কী?

বর্তমানে বেশিরভাগ ক্যাম্পে ধারণ ক্ষমতার চেয়েও অতিরিক্ত শরণার্থী বসবাস করছেন। অন্যদিকে নূরুল হুদা হাবীব নামক বসনিয়া প্রবাসী এক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জানান, ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় বসনিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থা তুলনামূলকভাবে দুর্বল। তাই শরণার্থীদের কেউই বেশিদিন বসনিয়া-হার্জেগোভিনায় থাকতে চান না।

মূলত অবৈধভাবে ইউরোপের দেশ ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স কিংবা পর্তুগালে প্রবেশের জন্য তারা বসনিয়ায় আসেন। এদের অনেকে ক্রোয়েশিয়ায় প্রবেশের সময় সেখানকার পুলিশের অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয় বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

এছাড়াও বাংলাদেশি শরণার্থীদের অনেকে সিরিয়ান কিংবা পাকিস্তানি অথবা আফগান শরণার্থীদের হাতে ছিনতাই ও ছুরিকাঘাতের শিকার হন। তাই বসনিয়াসহ দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক জোরদার করে এ রুটে মানবপাচার রোধের পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বৈধ উপায়ে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানি করার উদ্যোগ গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন।

এছাড়াও এসব বাংলাদেশি শরণার্থীদের মানবিকভাবে সহায়তা করার জন্য তিনি নেদারল্যান্ডসে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

ইন্টারপোলের রেড অ্যালার্ট

সিআইডির কর্মকর্তারা বলছেন, আমাদের দেশের কিছু দালাল রয়েছে। তারা বিভিন্নভাবে নানা প্রলোভন দেখিয়ে ইউরোপের ভয়ংকর যাত্রায় উদ্বুদ্ধ করছেন। তারা তো অবৈধভাবে যেতে পারছেন না, উপরন্তু মৃত্যুঝুঁকি তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে তাদের।

কর্মকর্তারা বলছেন, লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পার হয়ে গ্রিসে বা ইতালিতে আসার জন্য নৌকায় উঠে এখন পর্যন্ত শত শত বাংলাদেশি সাগরে ডুবে মারা গেছে। আবার হত্যারও শিকার হয়েছে। তাই মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত বিদেশে পলাতক দালালদের গ্রেপ্তারে শিগগিরই ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করা হবে।

লিবিয়ার মিজদাহ শহরে গুলি করে ২৬ বাংলাদেশি হত্যার পর মানবপাচারে জড়িতদের গ্রেপ্তারে এ পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সিআইডি। ওই আক্রমণে বেঁচে যাওয়া ১২ জনের মধ্যে ৯ জনকে ইতোমধ্যে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বাকি তিনজনকে আনা সম্ভব হয়নি।

ডিআইজি আবদুল্লাহেল বাকী বলেন, গত বছরের ২৮ মে লিবিয়ার মিজদাহ শহরে মানব পাচারকারীদের গুলিতে ৩০ জন নিহত হন। এর মধ্যে ২৬ জন ছিলেন বাংলাদেশি। ওই আক্রমণে আহত হন আরো ১২ জন বাংলাদেশি। এ ঘটনায় ২৬টি মামলা হয়। যার মধ্যে সিআইডি ১৫টি মামলার তদন্ত করছে। এসব মামলার ৪৪ আসামিকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

অরগানাইজড ক্রাইমের বিশেষ পুলিশ সুপার সৈয়দা জান্নাত আরা বলেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যে বিদেশে অবস্থারনত ৮ থেকে ১০ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করা হবে।

সুত্র, বাংলাদেশের খবর ।




নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..