আমাদের ছেলেরা রিক্সা চালায়- বলেই কেঁদে ফেললেন মির্জা ফখরুল


জনপ্রিয় অনলাইন : দলের নির্যাতিত নিপীড়িত নেতাকর্মীদের বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
 এক বিএনপি কর্মীর একটি ঘটনা বর্ণনা করতে মঙ্গলবার এক সভায় তিনি কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, প্রতিদিন গাড়িতে যাওয়া আসা করি। যানজটে গাড়ি থামলে দেখি সব ইয়াং ছেলে-পেলে ছুটে আসে। বলে স্যার আমি তো বিএনপি করতাম লক্ষীপুরে। এখন মামলার ভারে পালিয়ে চলে এসেছি ঢাকায়। এখানে হকারি করেছি। রিক্সা চালায় আমাদের ছেলেরা। এসময় কিছুক্ষণের জন্য বক্তৃতা থেকে যায়। কাঁদতে থাকেন বিএনপির মহাসচিব। তিনি বলেন, আমি দুঃখিত, আবেগ ধরে রাখতে পারছি না। আমাদের ছেলেদের এরকম করুন ---। এক ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আমরা আছি। গুম করলে খুঁজে পাওয়া যায় না। এজন্য কী আমরা একাত্তর সালে যুদ্ধ করেছিলাম? নতুন নতুন আইন হচ্ছে, এই আইনে এখন কথাও বলা যাবে না, আকারে ইঙ্গিতে যেকোনো কথা বললে সাজা হবে।
তিনি বলেন, আমরা যারা রাজনীতি করি, তারা ধরেই নিয়েছি শেষ জীবনে হয়ত জেলেই কাটাতে হবে। যতগুলো মামলা আছে, সেই মামলায় যদি ৫/১০ বছর করে জেল হয়, তাহলে ২৫০/২৬০ বছর সাজা হবে। হে মাবুদ তুমি রক্ষা করো।
রাজধানীর সেগুন বাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) মিলনায়তনে এই আলোচনা সভার আয়োজন করে বন্ধ থাকা দৈনিক আমার দেশ পরিবার। পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ বন্ধ করার প্রতিবাদে এই আলোচনা সভা হয়। ২০১৩ সালের ১১ এপ্রিল আমার দেশ পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। তবে অনলাইন সংস্করণ চালু ছিল। এরই মধ্যে গত ৪ আগস্ট আমার দেশ অনলাইন ভার্সনসহ ৩৫টি নিউজ সাইট বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক কমিশন- বিটিআরসি। 'আমার দেশ পড়তে চাই, মাহমুদুর রহমানের মুক্তি চাই
শীর্ষক এ সভার সার্বিক তত্ত্বাবধান করে অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিসিয়ার্স বাংলাদেশ (অ্যাব)।
সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রুহুল আমিন গাজীর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় অন্যান্যের মধ্যে কবি ফরহাদ মজহার, আমার দেশ
র নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব ও আমার দেশ এর নগর সম্পাদক এম আবদুল্লাহ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম প্রধান, আমার দেশ পত্রিকার বার্তা সম্পাদক জাহেদ চৌধুরী, সিনিয়র প্রতিবেদক কাদের গণি চৌধুরী, বিএনপির সহ-প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক শাকিল ওয়াহেদ, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুল প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আবদুল হাই শিকদার।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মির্জা ফখরুল বলেন, বর্তমানে দেশে
ডেমোক্রেটিক স্পেস একেবারেই নেই। আমরা যেটাকে রাজনৈতিক পরিসর বলি সেটা এখন একেবারেই অনুপস্থিত। একই কক্ষের বাইরে গিয়ে কথাও বলতে পারবেন না। কথা বললে হিসাব করে বলতে হবে বাইরে গিয়ে গ্রেফতার হবেন কিনা। সাধারণ মানুষগুলো আজ বড় কষ্টে আছে। তারা একটা দম বন্ধ করা পরিবেশের মধ্যে আছে। তারা স্বজন হারাচ্ছে, পুত্র হারাচ্ছে। তাদের জন্য আপনাদের সকলকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। আপনি যদি চান একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বাস করবেন, আপনি যদি আপনার স্বকীয়তা ও নিজস্বতাকে রক্ষা করতে চান। তাহলে অবশ্যই আপনাদের রুখে দাঁড়াতে হবে, সেই ঘুরে দাঁড়াতে হবে।
রাজধানীতে জনসভা করার স্থান ক্রমশ সঙ্কুচিত করে ফেলা হয়েছে উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, এখন পল্টন ময়দান আর নেই। এটা এখন আউটার স্টেডিয়াম, ভাসানী স্টেডিয়াম, জিমনিসিয়াম- পুরোটাই দখল হয়ে গেছে। শুধু এটাই নয় মুক্তাঙ্গন, সেখানে গিয়ে আমরা কথা বলতাম- সেটাও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। মানিক মিয়া এভিনিউতে বড় জনসভাগুলো করা হতো, সেখানে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আসার পরে মাঝখানে আইল্যান্ড নির্মাণ করে সেই রাস্তাকে বন্ধ করে দিয়ে সেখানে সভা-সমাবেশ বন্ধ করে দিয়েছে।
বর্তমানে সভা-সমাবেশ করার ক্ষেত্রে পুলিশের অনুমতির বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, এখন পুলিশের অনুমতি ছাড়া কোনো সভা করা যাবে না। সেই পার্টি অফিসের সামনেও সভা করতে দেবে না। আবার সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে সভা করতে চাইলে দিনক্ষণের ব্যাপার আছে। আগস্ট মাসে আমরা কোনো সভা করতে পারবো না। আমরা ৩১ আগস্ট দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনার জন্য ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশন মিলনায়তন চেয়েছিলাম। কর্তৃপক্ষ বলে দিয়েছে, ৩১ তারিখ পাবেন না, ১ সেপ্টেম্বর পাবেন। ৩১ আগস্ট আমরা দেবো না।
মির্জা ফখরুল অভিযোগ করে বলেন, আমাদের জেলা অফিসগুলোর অনেকগুলো খুলতেই পারে না, তালা-চাবি দিয়ে রাখা হয়। খুললেও পুলিশ বসে থাকবে, অনেক সময় অফিসের ভেতরে বসে থাকবে। আর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রায় দেখবেন, বেশ কিছু পুলিশ কার্যালয়ের সামনের জায়গাটাতে বসে আছে অথবা সাদা পোশাকধারীরা রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। হঠাৎ কর্মীদের ছোঁ মেরে সাদা মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। এই একটা অবস্থার মধ্যে আমরা আছি।
৩৫ টি অনলাইন ভার্সন বন্ধ হওয়ার পর গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ তেমন জোরালো না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ৩৫টি অনলাইন পত্রিকার একমুহূর্তে বন্ধ করে দেয়া হলো। একটা প্রতিবাদ আপনাদের (গণমাধ্যম) থেকে দেখিনি। আমরা বিবৃতি দিয়ে শেষ করে দিয়েছি। সাংবাদিক ভাইয়েরা কিন্তু জোরালো বাধার সৃষ্টি করতে পারেনি। এর যে প্রতিবাদ সেটা আপনারা করতে পারেননি, সেই পরিস্থিতি সেই পরিবেশ নেই। রাস্তায় বেরুলে আপনাদের গ্রেফতার করে নিয়ে যায়, শুধু আপনাকে না, আপনার সন্তানকে তুলে নিয়ে যাবে বলে হুমকি দেয়।
জঙ্গি অভিযানে কথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যার ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিদিন ক্রসফায়ার- একটা-দুটা-তিন চলছে। যতজনকে এই জঙ্গি সন্দেহে গ্রেফতার করা হয়েছে, তাদের একজনও কি বেঁচে আছে? সবাইকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হচ্ছে। তাহলে আপনারা তদন্ত কী তদন্ত করছেন? কোথায় জঙ্গিবাদ হচ্ছে, কিভাবে খবর নিচ্ছেন। গয়রহ জঙ্গিবাদের কথা বলে এখন হাজার হাজার বিরোধী দলের একেবারে গ্রাম পর্যায়ের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। এটাতে একদিকে ভয়ভীতি দেখানো হয় আর অন্যদিকে বাণিজ্যটা ভালো মতো হয়। প্রচুর পয়সা আমদানি হচ্ছে।
জাতীয় ঐক্য প্রসঙ্গ জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় খালেদা জিয়ার জাতীয় ঐক্যের আহবানের বিষয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমি বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গে যখন যোগাযোগ করি, কথা বলি, তারা বিভিন্ন শর্ত জুড়ে দেন। ঠিক আছে শর্ত জুড়ে দিচ্ছেন। যখন আপনার উপরে খড়গটা এসে পড়ছে, তখন আপনি কাকে শর্ত জুড়ে দেবেন। আজকে কিন্তু মাহমুদুর রহমান মান্না ছাড়া পাননি, আজকে কিন্তু রামপালে কয়লার উপরে ভিত্তি করে পাওয়ার প্ল্যান্ট তৈরি করার যারা প্রতিবাদ করছেন, রাস্তায় নামছেন, তাদের পা ভেঙে দিতে কিন্তু কুন্ঠাবোধ করছে না। আনু মুহাম্মদের মতো পন্ডিত ব্যক্তিকে রাস্তায় ফেলে দিয়ে মারতে কিন্তু কুন্ঠাবোধ করে না। কারণ সেটা তাদের স্বার্থের ব্যাপার আছে, সেটা তারা করবে।
সকলের প্রতি আহবান রেখে বিএনপির মহাসচিব বলেন, আজকে আমরা একটা বিষয়ে একমত হই, আমরা এখানে গণতান্ত্রিক পরিসর তৈরি করব, আমরা এখানে কথা বলার স্বাধীনতা নিশ্চিত করবো- এজন্য আমরা একবার এক হয়ে আওয়াজ তুলি। বার বার আমরা আহবান করছি। আসুন আমরা নিজেদের ভুল-ক্রটি, বিভেদ-দ্বন্দ্ব না বাড়িয়ে একসাথে আমরা আমাদের দাবিটাকে, আমাদের পাওনাগুলোকে বুঝে নেয়ার জন্য সোচ্চার হই।
নতুন প্রজন্মকে বাংলাদেশের সঠিক ইতিহাস জানার আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, আজকে দেশের বই-পত্রে যেসব ছাপা হচ্ছে তাতে ইতিহাসকে একেবারে ভিন্নভাবে দেখানো হচ্ছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে তা করা হচ্ছে।
প্রবীণ সাংবাদিক শফিক রেহমান, আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, নাগরিক ঐক্যের আহবায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার মুক্তির দাবি জানান বিএনপি মহাসচিব।
আওয়ামী লীগ বাংলাদেশকে বিভক্ত করেছে অভিযোগ করে অনুষ্ঠানে কবি ফরহাদ মজহার বলেন, তিনটি বড় আদর্শের ওপর ভিত্তি করে আমরা সেদিন ঐক্যবদ্ধ হতে পেরেছিলাম। তাহলে বিরোধটা তৈরি করলো কারা? বাংলাদেশেকে বিভক্ত করলো কারা? তিনি বলেন, আমরা তিনটি আর্দশের ওপর যুদ্ধ করছি। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। এই তিন আর্দশের ভিত্তিতে ওসমানি, জিয়াউর রহমান যুদ্ধ করেছিলেন এবং বাঙ্গালীদের সঙ্গে যুদ্ধ হয়েছিলো। কোনো আওয়ামী লীগের দলীয় ডাকে যুদ্ধ হয়নি। যতক্ষণ আপনারা এই বিষয়টি বুঝতে না পারবেন, ততক্ষণ বাংলাদেশটাকে আপনারা দিল্লির হাতে তুলে দেবেন এবং দিচ্ছেন।
তাহলে কি জন্যে আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে যুদ্ধ করেছিলাম এমন প্রশ্ন করে ফরহাদ মজহার বলেন, বাঙালি জাতীয়তাবাদের জন্যে? না সেটা নয়। ধর্ম নিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের জন্য যুদ্ধ করেছিলাম? না সেটাও না। ইতিহাস খুঁজতে চান বাড়িতে গিয়ে আমাদের সংবিধানটা একটু খুলবেন সেখানে পপুলেশন অব ইন্ডিপেনডেন্ট নামে সেখানে একটা ঘোষণা আছে। সেটা এপ্রিল মাসে ঘোষণা হয়েছিলো।
তিনি বলেন, জাতীয় রাজনৈতিক দল হিসেবে এখন যারা লড়াই করছেন তাদের মত প্রকাশের অধিকার আর্ন্তজাতিকভাবে স্বীকৃত আছে। বিরোধী দলে থেকে সমাবেশের অধিকার, কথা বলার অধিকার, সমালোচনা করার অধিকার এগুলো এখন খর্ব করা হয়েছে। তাদের ওপর হামলা মামলা নির্যাতন চলছে।

বিএনপি যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিলো তখন আপনারা সমালোচনা করেননি এ মন্তব্য করে ফরহাদ মজহার বলেন, বিএনপির কাছে সুযোগ নিয়েছেন, ননী মাখন খেয়েছেন। এখন এসে বলছেন, বিএনপিকে দিয়ে কিছু হবে না। আমি এটা শুনতে চাই না। আমি পুরনো দালালদের চিনি। দয়া করে বলবেন না। আর আপনি যদি পারেন সেটা কেনো বলছেন না।
তিনি বলেন, আমি বিএনপিকে সমালোচনা করেছি, খালেদা জিয়াকে বলেছি, যেদিন ইরাক আক্রমণ হয়েছে সেদিন আমি আমার বইতে লিখেছি এধরনের ঘটনা আপনার ক্ষেত্রেও হতে পারে।
ফরহাদ মজহার বলেন, বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে জোট করলো। এ নিয়ে আপনি সারাদিন কাটিয়ে দিলেন। কিন্তু প্রশ্নটা হলো জামায়াতকে সমালোচনা করেন, ইসলামপন্থিদের সমালোচনা করেন। বিএনপিকে আপনি কঠোর ভাষায় সামলোচনা করেন। কিন্তু আপনি কী চান? আপনি কী কথা বলার অধিকারে বিশ্বাস করেন?
তিনি বলেন, আপনি রাতের বেলায় ঘর থেকে মানুষকে ধরে নিয়ে যাবে র‌্যাব সাদা পোশাকে। তারপর দিন তার লাশ পাবে। এটা কি আপনি চান? আপনি কি চান দেশে একটি ঘাতক বাহিনী থাকুক? যদি আপনি না চান, তাহলে দয়া করে আপনি ক্যামেরার পেছনে থাকেন কিংবা সামনে থাকেন, আপনি কথা বলেন। আপনি কথা না বললে, বাংলাদেশকে ধ্বংস করার ক্ষেত্রে আপনার দায় ষোল আনা। এর সাথে বিএনপির কোনো সম্পর্ক নেই। এরসঙ্গে শেখ হাসিনার কোনো সম্পর্ক নেই।

Post a Comment

Contact Form

Name

Email *

Message *

Powered by Blogger.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget