গুলিবিদ্ধসহ আহত শতাধিক নির্বাচনী সহিংসতায় চার জেলায় ৬ জন নিহত

অনলাইন : চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের চতুর্থ ধাপে আজ শনিবার দেশের বিভিন্নস্থানে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের কেন্দ্র দখল করে সীলমারাসহ নানা অনিয়ম, ব্যাপক সহিংসতা ও পুলিশের গুলি বর্ষণের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। সংঘর্ষ ও পুলিশের গুলিতে বিভিন্নস্থানে ছয়জন নিহত ও গুলিবিদ্ধসহ শতাধিক লোক আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে নরসিংদীর রায়পুরায় দুইজন, রাজশাহীর বাঘমারায় দুইজন, কুমিল্লায় ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলায় একজন ও ঠাকুরগাঁয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় একজন রয়েছেন।
রায়পুরায় নিহত ২
নরসিংদী
জেলার রায়পুরা উপজেলার ২৩টি ইউপি নির্বাচন আজ কেন্দ্র দখল, ব্যাপক সহিংসতা, ককটেল বিস্ফোরণ ও সিলমারার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচনে সংঘর্ষে পাড়াতলী ও শ্রীনগর ইউনিয়নে দুইজন নিহত ও পাঁচজন আহত হয়েছেন। তবে রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আজহারুল ইসলাম শুধু পাড়াতলী ইউনিয়নে একজনের নিহত হওয়ার কথা নিশ্চিত করেন।
শ্রীনগর ইউনিয়নের রংপুর কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের প্রার্থী রিয়াজ মোরশেদ খান রাসেলের সমর্থকগণ নৌকা প্রতীকে সিলমারার চেষ্টা করলে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী আসাদুজ্জামান চৌধুরী আজাদের সমর্থকরা বাধা দিলে উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে আসাদুজ্জামান আজাদের সমর্থক সুমন (৩০) ঘটনাস্থলেই নিহত ও পাঁচজন আহত হন। দুপুরের দিকে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী মাসুদর রহমানের লোকজন পাড়াতলী ইউনিয়নের মধ্যনগর কেন্দ্র দখলের চেষ্টা করলে জাকির হোসেনের সমর্থকরা বাধা দিলে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এসময় আলী হোসেন (৫৫) নিহত হন।
এছাড়া আমিরগঞ্জ ইউনিয়নের আমিরগঞ্জ কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ চেয়ারম্যান প্রার্থী নাছির উদ্দিন খানের লোকজন দুপুর ১২টার দিকে কেন্দ্র দখল করে জাল ভোট দেন। এসময় দলটির বিদ্রোহী প্রার্থী ফজলুল করিম ফারুকের সমর্থকরা বাধা দিলে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হলে অন্তত সাতজন আহত হন। এদিকে বাঁশগাড়ী ইউনিয়নে আলীগ চেয়ারম্যান প্রার্থী হাফিজুর রহমান নির্বাচন বর্জন করেছেন।
কুমিল্লায় যুবক নিহত 
কুমিল্লা সংবাদদাতা জানান, ভোট চলাকালে জেলার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নের উত্তর চান্দলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের বাইরে আওয়ামী লীগ সমর্থিত দুই মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে তাপস চন্দ্র দাস (৩৪) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। ব্যালট বাক্স ছিনতাই, কেন্দ্র দখল ও প্রিজাইডিং কর্মকর্তাদের সহায়তায় নৌকা প্রতীকে সিল মারার অভিযোগে চৌদ্দগ্রাম ও ব্রাহ্মণপাড়ায় দুটি, চান্দিনায় চারটি এবং মনোহরগঞ্জে দুটি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে।

পুলিশ জানায়, আজ শনিবার সকাল সোয়া ১০টার দিকে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নের উত্তর চান্দলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের বাইরে মেম্বার প্রার্থী সুলতান আহাম্মদ ও রেজাউল করিমের কর্মী সমর্থকদের মাঝে সংঘর্ষ ও ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়। এ সময় মেম্বার প্রার্থী রেজাউলের সমর্থক তাপস চন্দ্রকে কুপিয়ে ঘটনাস্থলেই হত্যা করা হয়। নিহত তাপস চান্দলা গ্রামের কানু চন্দ্র দাসের পুত্র এবং পেশায় রাজমিস্ত্রী। নিহতের পরিবার এ হত্যাকাণ্ডের জন্য মেম্বার প্রার্থী সুলতান আহাম্মদের সমর্থকদের দায়ি করেছেন। বিকালে ব্রাহ্মণপাড়া থানার ওসি বদিউজ্জামান জানান, দুই মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষে তাপস নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের করার কথা রয়েছে। নিহতের লাশ আজ বিকেল সোয়া ৩টার দিকে কুমেক হাসপাতাল মর্গে আনা হয়েছে। আজ তার ময়নাতদন্ত করা হবে বলে কুমেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। এদিকে নৌকা প্রতীকে সিল মারায় সহায়তা করাসহ নানা অভিযোগে চৌদ্দগ্রাম, মনোহরগঞ্জ, চান্দিনা ও ব্রাহ্মণপাড়ায় ৪ প্রিজাইডিং অফিসারকে আটক করা হয়েছে।
এদিকে চৌদ্দগ্রাম ও মনোহরগঞ্জে সরকার দলীয় প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের কেন্দ্র দখল, এজেন্টদের মারধর, জাল ভোটসহ কেন্দ্রে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে ১৩ ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী ভোট বর্জন করেছেন। শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিএনপি, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী, স্বতন্ত্র ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ১৩ চেয়ারম্যান প্রার্থী সাংবাদিক সম্মেলন করে তারা ভোট বর্জনের এ ঘোষণা দেন।
ঠাকুরগাঁওয়ে নিহত ১ 
ঠাকুরগাঁও সংবাদদাতা জানান, জেলার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার পাড়িয়া ইউনিয়নের কালডাঙ্গা দাখিল মাদরাসা কেন্দ্রে আজ দুপুরে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে একজন নিহত হয়েছেন। এসময় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন আরো আটজন। তাদের মধ্যে গুরুতর একজনকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুর দেড়টার দিকে ভোট চলাকালে দুই মেম্বার প্রার্থী গিয়াসউদ্দিন ও আলমের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে। সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে আনতে না পেরে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা প্রথমে রাবার বুলেট এবং পরে ফাঁকা গুলি চালায়। এসময় গুলিতে মাছখুরিয়া গ্রামের আব্দুল জব্বারের ছেলে মাহবুব হোসেন ঘটনাস্থলে নিহত হয়। সে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। গুলিবিদ্ধ চারজনের মধ্যে গুরুতর অবস্থায় মোড়লহাট গ্রামের নাজিমউদ্দিনকে (৫৫) রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। একই গ্রামের সহিদুল ইসলাম (৩৫), রহিমুল হক( ৩০) কবীর হোসেনসহ (৩৫)সহ ৮ জনকে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) আবুল কাশেম বলেন, আহত অবস্থায় ৮ জনকে হাসপাতালে আনা হয়। এর মধ্যে মাহবুবকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা।
বাগমারায় আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপে সংঘর্ষে নিহত ২, আহত ৪০ 
রাজশাহী ব্যুরো জানায়, জেলার বাগমারা উপজেলার আউচপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের মনোনীত ও বিদ্রোহী প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের সময় পুলিশের গুরিতে দুজন নিহত ও কয়েকজন গুলিবিদ্ধসহ অন্তত ৪০ জন আহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন- সিদ্দিকুর রহমান (৩০) ও জাহিদুর রহমান বুলু। স্থানীয়রা তাদের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। আহতদের বিভিন্ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ক্লিনিকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

একটি সূত্র জানায়, নিহতের সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে। এ ঘটনায় ওই এলাকায় থমথমে অবস্থা অবস্থা বিরাজ করছে। ঘটনাস্থলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শনিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী সরদার জান মোহাম্মদ মিছিল নিয়ে হাটগাঙ্গোপাড়া বাজারে যান। এসময় দলটির বিদ্রোহী প্রার্থী শহিদুল ইসলামের সমর্থকদের সাথে তাদের বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে সংঘর্ষ বেধেঁ যায়। সংঘর্ষকালে দুপক্ষই হাত বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এসময় পুলিশ লাঠি চার্জ শুরু করলে হামলাকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে বাজারে দোকানপাটে হামলা চালায়। পরে পুলিশ কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ঘটনাস্থলে পুলিশ ও র‌্যাব যৌথভাবে টহল দিচ্ছে।
অপর একটি সূত্র জানায়, শনিবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে আওয়ামী লীগের আউচপাড়া ইউনিয়নে চেয়ারম্যান প্রার্থী সরদার জান মোহাম্মদের লোকজন বিদ্রোহী প্রার্থী শহিদুজ্জামান শহিদের বাড়িতে হামলা চালায়। এসময় শহিদুলের লোকজন জান মোহাম্মদের লোকজনকে প্রতিহত করতে গেলে উভয়পক্ষের সংঘর্ষ হয়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গুলি ছুড়লে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে।
হাটগাঙ্গোপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপরিদর্শক (এসআই) মাসুদ আলী সাংবাদিকদের জানান, গুলিতে একজন মারা গেছেন। তিনি দাবি করেন, পুলিশের পাঁচ সদস্য আহত হয়েছেন।

এ ব্যাপারে জানতে রাজশাহী জেলা পুলিশ সুপার নিশারুল আরিফ ও বাগমারা থানার ওসি মতিউর রহমানের সাথে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কল রিসিভ করেননি।

Post a Comment

Contact Form

Name

Email *

Message *

Powered by Blogger.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget