হিলারি প্রেসিডেন্ট হলে কী প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে?

অনলাইন ডেস্ক : আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন দিন দিন এগিয়ে আসছে। চলতি বছরের ৮ নভেম্বর এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ মুহূর্তে চলছে আমেরিকার রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট দল থেকে প্রার্থী মনোনয়নের লড়াই। সে লড়াইয়ে বিরোধী রিপাবলিকান দল থেকে নির্বাচনী দৌড়ে এগিয়ে আছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প আর ক্ষমতাসীন ডেমোক্র্যাট দল থেকে এগিয়ে আছেন হিলারি ক্লিনটন।

হিলারি বিশ্ববাসীর কাছে যেসব কারণে পরিচিত হয়ে উঠেছেন তার বড় একটি কারণ হচ্ছে- তার স্বামী বিল ক্লিনটন দুইবার প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। হিলারি সম্প্রতি বলেছেন, ২০১৬ সালে নির্বাচনে বিজয়ী হলে তিনি তার স্বামী বিল ক্নিনটনকে মন্ত্রিসভায় কোনো পদ দেবেন না। বোঝা যাচ্ছে আত্মবিশ্বাসটা অনেক বেশি। কিন্তু সেই আত্মবিশ্বাসের কতটুকু প্রতিদান দেবে মার্কিন জনগণ তা দেখার জন্য আামদের অপেক্ষা করতে হবে আরো কয়েক মাস।
হিলারি ক্লিনটন বাংলাদেশের মানুষের একাংশের কাছে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি আর অন্য অংশের কাছে অনেকটা ঘৃণিত। যাদের কাছে কাঙ্ক্ষিত তারা মনে করেন- হিলারি নির্বাচিত হলে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পালাবদলে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবেন। আর যারা মনে করেন- অতীতে হিলারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার সময় বাংলাদেশের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়েছেন এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করেছেন তারা চান না হিলারি নির্বাচিত হোক।
২০০৮ সালের নির্বাচনে বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ওবামার প্রথম দফার সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন হিলারি। সে সময় বাংলাদেশের কিছু ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি। এর মধ্যে গ্রামীণ ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানটির সাবেক প্রধান নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূসের বিষয় ছিল অন্যতম। ড. ইউনূস ক্লিনটন পরিবারের সঙ্গে বিশেষ ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি এবং তার নোবেল পাওয়ার বিষয়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের নাকি বিশেষ প্রচেষ্টা ছিল। সেই ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার যখন খড়্গহস্ত হয় তখন তাতে খানিকটা বাধসাধেন হিলারি ক্লিনটন।
এ নিয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন পর্যন্ত করেছিলেন। সেই ফোনালাপ পরে বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় এবং যায়যায় দিন পত্রিকার সাবেক সম্পাদক শফিক রেহমান তার একটি কলামে সাক্ষাৎকারের বাংলা অনুবাদ তুলে ধরেছিলেন। তা থেকে জানা গিয়েছিল- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের মধ্যে কিছুটা ভিন্নধর্মী আলোচনা হয়। খানিকটা প্রাসঙ্গিক হওয়ায় সেই ফোনালাপের কিছু অংশ এখানে তুলে ধরলাম। হিলারি বলেছিলেন-
আমি ভেবেছিলাম আমাকে এত দূর যেতে হবে না। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য, আমি ভুল ভেবেছিলাম। আপনি জানেন এবং আমরাও জানি কীভাবে আপনার সরকার ক্ষমতায় এসেছে। ভুলে যাবেন না, নির্বাচনের পর আমরা বলেছিলাম, সেটা অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে এবং আপনাকে সাহায্য করেছিলাম। প্রধানমন্ত্রী, আপনি জানেন দিল্লিতে আমাদের বন্ধুদের নির্দেশে কীভাবে ফলাফল আগেই ঠিক করা হয়েছিল। তারা যেভাবে চেয়েছিল সেভাবেই আমরা চলেছিলাম। প্লিজ, আপনি এটাও ভুলে যাবেন না যে, জেনারেল মইন যিনি আপনাকে ক্ষমতায় এনেছিলেন তিনি এখন আমেরিকাতে আছেন এবং আপনি যতখানি কল্পনা করতে পারেন, তার চেয়েও বেশি এখন আমরা জানি। আমি বলছি না যে, আমরা এখনই আপনার কাছ থেকে দূরে সরে যাব। আমি শুধু ঐতিহাসিকভাবে বিভিন্ন ইসু তুলে ধরছি।
ফোনালাপে ড. ইউনূস প্রসঙ্গ এবং বাংলাদেশের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের বিষয়টি নাকি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। সেই কারণে যারা বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় দেখতে চান না তারা আশা করেন- হিলারি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে তাদের জন্য সুবিধা হবে। তাদের অনেকে হয়ত ধারণা করেন- হিলারি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের জন্য ব্যবস্থা নেবেন। কিন্তু আসলে কী তাই? সে আলোচনায় আরো একটু পরে আসছি।
যারা বর্তমানে ক্ষমতায় আছেন তারা মুখে যতই বলুন না কেন আমেরিকাসহ বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ভালো- আসলে কিন্তু ততটা নয়। বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয়েছে বটে। আমেরিকার সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে আরো বেশি।
সে কথা আমরা পরিষ্কার বুঝতে পারি সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমদের বক্তব্য থেকে। তিনি কিছুদিন আগে জিএসপি প্রসঙ্গে তার হতাশা প্রকাশ করে যে বক্তব্য দিয়েছেন যতদূর মনে করতে পারি তা এমন- কিয়ামত পর্যন্ত আমেরিকা বাংলাদেশকে জিএসপি দেবে না। শুধু তাই নয়, সরকারের সাবেক এলজিআরডি মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনাকে তাচ্ছিল্য করে কাজের মেয়ে মর্জিনা বলেছিলেন।
এ সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মাদ নাসিমসহ আরো অনেক মন্ত্রী ও নেতা আমেরিকার বিরুদ্ধে মাঝেমধ্যেই ক্ষোভ প্রকাশ করছেন তা আর গোপন কিছু নয়। এমনকি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও জঙ্গি ইস্যুতে সরকারের অনেক দায়িত্বশীল ব্যক্তি আমেরিকার সঙ্গে ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন। সেসব মতামত ঠিক-বেঠিক প্রসঙ্গে যাচ্ছি না; শুধু আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে মতপার্থক্য রয়েছে তা তুলে ধরছি।
দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ইস্যুতে মার্কিন সরকারের উদ্বেগ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের কেউ কেউ বলেছেন, আমেরিকার চেয়ে বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভালো। অবশ্য, এ কথাও ঠিক যে, মার্কিন সরকারের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়ার কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বে শক্ত শাসক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। অনেকে তার এ অবস্থানকে শ্রদ্ধার চোখে দেখেন।
তবে আমেরিকার সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের যে দ্বন্দ্ব ও মতপার্থক্য আছে তাতে সন্দেহ নেই। সেই কারণে আওয়ামী লীগ ও তাদের হিতাকাঙ্ক্ষীদের মনের চাওয়া হতেই পারে- হিলারি যেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত না হন।
এখন প্রশ্ন থাকছে- হিলারি যদি প্রেসিডেন্ট তাহলে তিনি কী আসলেই আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন? জবাবে বলব- সেই টেলিফোন সংলাপ যদি সত্যি হয় তাহলে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার কথা।
আমরা বিশ্বের বহু ঘটনা থেকে জানতে পারি- আমেরিকা সাধারণত স্বল্প মেয়াদে কম কাজ করে বরং তাদের থাকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। যদি সেই টেলিফোন সংলাপ সত্যি হয় তাহলে দীর্ঘমেয়াদে হলেও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে একটা প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার চেষ্টা করবেন হিলারি। সে প্রচেষ্টার ফলাফল কী হবে আমরা কেউ জানি না।
কিন্তু সত্যি যদি না হয়ে থাকে তাহলে দীর্ঘদিন ধরে বহু মানুষ শুধু একটা ইন্দ্রজালে আচ্ছন্ন থাকল। তবে ভাবসাবে বেশ বোঝা যাচ্ছে- আওয়ামী লীগের সঙ্গে ডেমোক্র্যাট দলের সম্পর্ক ভালো নয়। সম্পর্ক ভালো নেই তাতে খুব যে ক্ষতি হয়েছে আওয়ামী লীগের তাও তো নয়।
আওয়ামী লীগের বড় সুবিধা হচ্ছে- আমেরিকা যদি বন্ধুত্বের হাত নাও বাড়ায় তাহলে রাশিয়া ও ভারতের মতো বড় গুরুত্বপূর্ণ শক্তি আওয়ামী লীগের পাশে থাকবে। অবশ্য, বন্ধুত্বের এ অর্জনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত কৃতিত্ব সিংহভাগ। কারণ তার একক নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সরকার পরিচালিত হয়; তিনিই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সব সিদ্ধান্ত নেন।
সে কারণে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কের অবনতি থাকলেও খুব একটা সমস্যা হওয়ার কথা নয়। এছাড়া, নানা প্রেক্ষাপটে সম্পর্ক ওঠানামা যে করবে না, আওয়ামী লীগের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন হবে না তাও নয়। হিলারির কাছে বাংলাদেশের বিরোধী শক্তিকে ক্ষমতায় বসানোর চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ তার নিজ দেশের স্বার্থ। সেই স্বার্থের অনুকূলে থাকলে আওয়ামী লীগও মুহূর্তে বন্ধু হয়ে যাবে আমেরিকার।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা হিসাব-নিকাশে রাশিয়াকে শত্রু ভাবলেও ভারতকে বন্ধু ভাবতে বাধ্য হচ্ছে আমেরিকা। সে কারণে যতক্ষণ ভারত না চাইবে ততক্ষণ পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ায় বিশেষ করে উপমহাদেশের রাজনীতিতে আমেরিকার চাওয়ার গুরুত্ব নেই। এখন পর্যন্ত এটাই বাস্তবতা।
ফলে হিলারি নির্বাচিত হলেও আওয়ামী লীগের জন্য নিরাপত্তার প্রশ্ন অটুট থাকছে। ভারতের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক ভালো। মার্কিন রাজনীতিতে ইহুদি লবির প্রভাব সবার জানা। মিত্র শক্তি ভারতের মাধ্যমে মার্কিন সেই লবিকে পক্ষে রাখাও আওয়ামী লীগের জন্য কঠিন কিছু নয়।
এছাড়া, ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক ও সমসাময়িক যেসব প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের বন্ধুত্বের বন্ধন তৈরি হয়েছে; আওয়ামী বলয়ের বাইরের কোনো দল বা শক্তি ভারতের সঙ্গে সেই সম্পর্ক রচনা করতে পারে নি, হয়ত পারা সম্ভবও নয়। নিকট ভবিষ্যতে হবে বলেও মনে হয় না।
আমেরিকা কিংবা রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রায় একই কথা। আওয়ামী লীগ যেমন ভারত ও রাশিয়ার মতো দেশকে একনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে পেয়েছে, অন্য কোনো দল বা সংগঠন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্তিশালী এমন কোনো দেশকে একনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে পায় নি।
এ জায়গা থেকে নিশ্চয় আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ অনেক বেশি এগিয়ে। সম্পর্ক রচনার ক্ষেত্রে লেনদেন বা সুযোগ-সুবিধা দেয়ার প্রশ্ন হয়ত থাকে কিন্তু তাদের সঙ্গে সম্পর্ক যে ভালো সে বাস্তবতা অস্বীকার করা যাবে না। আওয়ামী লীগের কাছ থেকে অনেকের অনেক কিছু শেখার আছে।

যদি কেউ সরকার পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেন তাহলে তাদেরকে নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়ে, নিজেদের বুদ্ধি-মেধা খাটিয়ে, নিজেদের শক্তি দিয়ে আন্দোলন করে অথবা সেই রকম জনমত তৈরি করে ক্ষমতায় যেতে হবে। হিলারি ক্লিনটন এসে ক্ষমতা পরিবর্তন করে দিয়ে যাবেন- ভাবার কোনো কারণ নেই।

Post a Comment

Contact Form

Name

Email *

Message *

Powered by Blogger.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget