মুজিবনগর সরকার ছিল একাধারে বৈপ্লবিক ও গণতান্ত্রিক

মুজিবনগর সরকার ১৯৭১ সালে ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ আমতলায় শপথ নিয়েছিল। ওই সরকারের রাষ্ট্রপতি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শারীরিকভাবে তিনি অনুপস্থিতির কারণে (পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকায়) বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে ও তাজউদ্দিন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ পাঠ করানো হয়। তারাই সরকারের নেতৃত্ব দেন। মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর নামে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়। হঠাৎ করে অগণতান্ত্রিক ও অনিয়মিতভাবে মুজিবনগর সরকার গড়ে ওঠেনি। বরং এর ভিত্তি ছিল একেবারেই গণতান্ত্রিক। ১৯৭০-এর নির্বাচনে একচ্ছত্রভাবে বিজয়ী হয়ে পাকিস্তানের সর্ববৃহৎ দলের নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতিতে পাকিস্তানি শাসকদের কেউ কেউ বঙ্গবন্ধুকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সম্বোধন করেছিলেন। তাদের ধারণা ছিল বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রিত্ব পেলেই ১৯৭০-এর নির্বাচনে যে ৬ দফা ভিত্তিক ম্যান্ডেট তিনি পেয়েছিলেন, তা অগ্রাহ্য করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণ করবেন। ভুট্টো ও সামরিক শাসকরা আলোচনার টেবিলে বসে এই ব্যাপারে দর কষাকষি হলে, বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট ভাষায় বললেন, তিনি প্রধানমন্ত্রিত্ব চান না, বাংলার মানুষের অধিকার চান। এরপরেই শুরু হলো সংঘাত।
১ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন শুরু হওয়ার যে ঘোষণা পাকিস্তানের শাসকরা দিয়েছিলেন, তা হঠাৎ বাতিল করা হলো। শুরু হলো যুদ্ধের প্রস্তুতি। পাকিস্তান থেকে সৈন্য, রসদ এবং অর্থ দুই-ই পূর্ব পাকিস্তানে আসা শুরু হলো। বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে বিন্দুমাত্র পিছপা হলেন না। অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন। ৭ মার্চের ঘোষণায় সর্ব প্রথমে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলেন সংগ্রামের মূল লক্ষ্য হচ্ছে মুক্তি ও স্বাধীনতা। ৬ দফার মূল লক্ষ্য যে ১ দফা ছিল, তা তিনি আর গোপন রাখলেন না। ২৫ মার্চের কালরাতেই তারা সার্চ লাইট অপারেশনের মাধ্যমে হাজার হাজার নিরীহ বাঙালিকে হত্যা করল। পাকিস্তান কর্তৃক আক্রমণ করার পরপরই ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা করলেন। ওই ঘোষণায় তিনি বাংলার মানুষকে সর্বাত্মকভাবে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সম্পূর্ণরূপে পরাস্ত না করা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে বললেন। শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। জাতীয় পরিষদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা ভারতে গিয়ে পরবর্তী কর্মসূচি গ্রহণ করার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় সৃষ্টি হয় মুজিবনগর সরকার। এই সরকারের প্রকৃতি ছিল একদিকে গণতান্ত্রিক, নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সম্মিলিতভাবে জনগণের ম্যান্ডেটের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে জনগণের সরকার গঠন করলেন। এটাই মুজিবনগর সরকার। নয় মাসের সশস্ত্র যুদ্ধ করে এই সরকার পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে রূপান্তরিত করলেন। এই সরকার অবশ্যই বিপ্লবী চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষায় একাত্তরের ৯ মাসের সশস্ত্র সংগ্রামকে প্রথম বিপ্লব বলে অভিহিত করা হয়েছে। অনেকে বিপ্লবের এই ধারণা স্বীকার করতে রাজি নন। বিশেষ করে বামপন্থীরা এই নিয়ে বিতর্ক তুলেছিলেন। এ কাজ যে বিপ্লব ছিল, বঙ্গবন্ধু দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি গ্রহণ করে তা প্রতিষ্ঠিত করলেন। কেন তিনি একে বিপ্লব বলেছিলেন, তার ব্যাখ্যাও তিনি বিভিন্ন সময় দিয়েছেন। বিপ্লবের লক্ষ্য কতটুকু অর্জিত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। প্রতিবিপ্লব এই বিপ্লবের কতটা ক্ষতিসাধন করেছে, তা নিয়েও আলোচনা হতে পারে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তাঁর ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। বিপ্লবী মন-মানসিকতার কারণেই এই অবিস্মরণীয় উক্তি করা হয়েছিল। ওই মুক্তির জন্য প্রয়োজন ছিল রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন। শুধু জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় পতাকাই তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল না। একটা ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থাকে তিনি জাতিরাষ্ট্র সমাজে রূপান্তরিত করতে চেয়েছিলেন। এটাই ছিল বঙ্গবন্ধুর বিপ্লবের মূল দর্শন। প্রতিবিপ্লবের কারণে বঙ্গবন্ধু এটা সফল করে যেতে পারেননি। সুদীর্ঘ দেড় দশক প্রতিক্রিয়াশীল ধারায় দেশ পরিচালিত হওয়ায় তার কন্যা দেশরতœ শেখ হাসিনাও পরবর্তী সময় ওই বিপ্লব সম্পন্ন করতে সক্ষম হননি। ঐতিহাসিক বাস্তবতাই এর জন্য মূলত দায়ী। বিশ্ব আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের যে পরিবর্তন এসেছে, তাতে ওই বিপ্লব আক্ষরিক অর্থে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তাই বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা বিকল্প পথে দেশ ও জনগণের কল্যাণ সাধন কিভাবে করা যায় সেই পথ ধরেই সুকৌশলে তিনি এগুচ্ছেন। যারা বলতে চান, শেখ হাসিনা তার পিতার আদর্শ অনুসরণ করছেন না বা ওই ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, তাদের অনুধাবন করা উচিত স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর বাংলাদেশকে কোন আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক পর্যায়ে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। শুধুমাত্র ভাবাদর্শে দীক্ষিত হয়েই এই বাস্তবতাকে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। তবে যতটুকু অনুসরণ করলে জনগণের সবচেয়ে বেশি কল্যাণ সাধন করা যায় সেই পথেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অগ্রসর হচ্ছেন। পিতার আদর্শ থেকে তিনি সরে গেছেন এরূপ চিন্তা করা সঠিক হবে না।
মুজিব নগর সরকার সত্যি সত্যিই অসাধারণ। বিদেশের মাটিতে অবস্থান নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা পূর্ব পাকিস্তানের মতো সমতল নদীমাতৃক ভূমিতে এটা খুব সহজ কাজ ছিল না। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে, আমরা অবশ্যই অনুধাবন করতে পারতাম সংকটের মাত্রা কত বিস্তৃত ছিল। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বিষয়টি বুঝেই সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সমস্যার সমাধানের জোর দাবি তুলে তিনি অল্প সময়ের মধ্যে কটনৈতিক সফলতা অর্জন করলেন এবং বাঙালি জাতিকে চরম ক্ষয়-ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করলেন। যুদ্ধে ৩০ লাখ বাঙালিকে জীবন দিতে হয়েছে। কিন্তু বাঙালির প্রকৃত সম্পদ গ্রামীণ অর্থনীতিকে পাকিস্তান ধ্বংস করতে উদ্যত হলেও সফল হতে পারেননি এবং সেই কারণেই বঙ্গবন্ধু মাত্র তিন বছরের মাথায় দেশকে খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন। যে পোড়ামাটির নীতি পাকিস্তান গ্রহণ করেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধ নয় মাসের চেয়ে বেশি সময় দীর্ঘায়িত হলে গ্রামীণ অর্থনীতি ধ্বংস হতো, লাখ লাখ মানুষের অনাহারে প্রাণ যেত। জনাব তাজউদ্দিনের নেতৃত্বে মুজিবনগর সরকার যুদ্ধ ও দেশ পরিচালনা সফলভাবে করেছে। তবে কেন যে তৎকালীন মেজর জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষণার পর কালুরঘাটের বেতারকেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে নিজ নামে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করলেন, সেই কারণে ওই সরকারের উচিত ছিল কোর্ট মার্শাল করে মেজর জিয়ার বিচার করা। তাহলে সুদীর্ঘ কয়েক বছর স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে যে বিতর্ক, ভণ্ডামি ও মিথ্যাচার চলছে এর পরিসমাপ্তি ঘটত। মুজিবনগর সরকারকে শ্রদ্ধা রেখেই বলতে হয় হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণ পর্যায়ে আর একটু সতর্ক ও কৌশলী হলে হয়তো ইতিহাসের পাতায় ভিন্ন রকম মন্তব্য আসতে পারত। জাতির মর্যাদা আরো সুরক্ষিত হতো। এ সরকারকে একদিকে বৈপ্লবিক, অন্যদিকে সম্পূর্ণভাবে গণতান্ত্রিক বলে অভিহিত করত।
এই সরকারের নামকরণ অত্যন্ত সার্থক। ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলার আম্রকাননে একজন মাত্র বঙ্গবন্ধুর কারণেই সেই সূর্য আবার উদিত হয়। তাই ওই আম্রকাননকে মুজিবনগর নামকরণ সার্থক ছিল। যদিও ওই সরকারের ৮নং থিয়েটার রোড, কলকাতায় প্রধান কার্যালয় থাকলেও এই সরকারের বিস্তৃতি ত্রিপুরা, পশ্চিম বাংলা, মেঘালয় বিভিন্ন জায়গায়, এমনকি বিদেশে এই সরকারের কার্যালয় ও মন্ত্রণালয় ছিল। মুজিবনগর সরকারের প্রধান কার্যালয় ৮নং থিয়েটার রোড, কলকাতায় থাকলেও এই সরকার স্বাধীন বাংলার মাটিতে গঠন করে বিচক্ষণতা ও দূরদৃষ্টির পরিচয় দেন। সরকারের সেক্টর কমান্ডাররা নিজ নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবেই পালন করেছেন। তবে যেভাবে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখার জন্য মূল্যায়ন করা হয়েছে, সেইভাবে ওই যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী, অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের যথার্থ মূল্যায়ন হয়েছে বলে মনে হয় না। পদক প্রাপ্তি ও মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর সদস্যদের যেভাবে মূল্যায়িত হয়েছে, সেই বিচারে জননেতাদের সঠিক মূল্যায়ন করা হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যখন কয়েক খণ্ডে রচিত হয় তখন এই ব্যাপারে লক্ষ রাখা হয়নি। ক্ষেত্র বিষয়ে অনেকের কম মূল্যায়ন করা হয়েছে, অথচ তারা মহান মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান পালন করেছেন। দেশের প্রয়োজনে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে যারা যুদ্ধ করেছেন, প্রাণ দিয়েছেন, পঙ্গুত্ব বা সাধারণ জীবনযাপন করছেন, দেশরতœ শেখ হাসিনার সময়ে তার কোনো কোনো ব্যক্তির মূল্যায়ন করা হলেও অনেকেই আজো ইতিহাস বহির্ভূত থাকবেন। দুঃখ লাগে যখন দেখি বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস বা ৪৫ বছর আগে যা ঘটে গেছে এবং তখনকার কেউ কেউ এখনো জীবিত আছেন, স্বচক্ষে ঘটনাপ্রবাহ দেখেছেন যখন এর ব্যত্যয় ঘটে, বিকৃত ইতিহাস ইচ্ছাকৃতভাবে উপস্থাপিত হয়, সরকারের উচিত এসব ব্যাপারে দৃষ্টি ও মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা।

ডা. এস এ মালেক : কলামিস্ট ও বিশিষ্ট রাজনীতিক।

Post a Comment

Contact Form

Name

Email *

Message *

Powered by Blogger.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget