তৃতীয় দফা ইউপি নির্বাচন আরো বেপরোয়া ক্ষমতাসীনরা : দখল ও সহিংসতার শঙ্কায় কাল ভোট

ঢাকা : আগামীকাল শনিবার দেশের ৬২০ ইউনিয়ন পরিষদে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে তৃতীয় দফার ভোট। সরকার ও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে অবাধ ও সুষ্ঠু ভোটগ্রহণে বারবার আশ্বাস দেয়া সত্ত্বেও ইউপি নির্বাচনে প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় ব্যাপক সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। তৃতীয় দফায় পরিস্থিতি আরো ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। দলীয় আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে কেন্দ্র দখলে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে সরকার দলীয় নেতাকর্মীরা বলেই ইতিমধ্যে অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন মহলে। বিরোধী দলের অভিযোগ পুলিশ, বিজিবি, নির্বাচনী কর্মকর্তা ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা মিলে প্রথম দু'দফা ভোট ডাকাতির পর আগামীকাল শনিবার অনুষ্ঠেয় তৃতীয় ধাপের নির্বাচনে তারা আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ডিসি, এসপি, রিটার্নিং অফিসার ও ওসিরা ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রণেই স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন ঠেকাতে মাঠে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হলেও তারা থানা সদরের বাইরে যাচ্ছেন না। রিটার্নিং অফিসারদের কেউ কেউ ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের কথায় চলছেন। ক্ষমতাসীনদের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে ডিসি-এসপিরা সহযোগিতা করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে নির্বাচন কমিশন থেকে ডিসি-এসপিদের ফোন করলেও তারা বিরক্ত হচ্ছেন বলে সূত্র জানিয়েছে।এদিকে বিভিন্ন এলাকা থেকে সংঘর্ষ-সংঘাতে হতাহত এবং প্রাণনাশের হুমকির খবরাখবরও আসছে।গতকাল নেত্রকোনার কলমাকান্দায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থিত এবং বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছে। কলমাকান্দা উপজেলার নাজিরপুর বাজারে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আবদুল আলী ও আলীগের বিদ্রোহী আনারস প্রতীকের প্রার্থী আবদুল কুদ্দুস বাবুলের সমর্থকদের মধ্যে এ সংঘর্ষ হয়। এছাড়া কুমিল্লায় সরকারদলীয় সমর্থকদের তান্ডব চলছে। বিএনপি প্রার্থী ও সমর্থকদের বাড়িঘরে হামলা, ভাংচুর অব্যাহত রয়েছে। কুমিল্লা জেলার লাকসাম উপজেলার ৩ নম্বর কান্দিরপাড় ইউনিয়নের বিএনপির প্রার্থী নূর হোসেন হামিরাবাদ গ্রামে তার নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে গেলে সরকারদলীয় সমর্থকরা প্রচারণায় বাধা সৃষ্টি করে। একপর্যায়ে ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সাগরের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে ও তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। একই কায়দায় ইউপি সদস্য প্রার্থী হাবিবুর রহমানের বাড়িতেও হামলা চালিয়ে লুটপাট ও ভাংচুর করা হয়। সরকারের ছত্র-ছায়ায় থেকে সন্ত্রাসী বাহিনী বিরোধী প্রার্থীর প্রচার-প্রচারণায় চলাকালে তাদেরকে পিটিয়ে আহত করে ও মাইক ছিনিয়ে নেয়। বিএনপি প্রার্থী মীর হোসেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর অভিযোগ করেও কোনো ফল পান নি।আগামীকাল কুমিল্লা জেলার বুড়িচং উপজেলার ৬টি ইউনিয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ৬টি ইউনিয়নেই পুলিশ ও আওয়ামী লীগের কর্মীরা প্রার্থী ও এজেন্টদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হামলা ও ভাঙচুর করেছে। এর মধ্যে ময়নামতি ইউনিয়ন, রাজাপুর ইউনিয়ন, মোকাম ইউনিয়নে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা ব্যাপক তা-ব চালাচ্ছে। এসব ইউনিয়ন থেকে গত বুধবার বেশ কয়েকজন বিএনপি সমর্থককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। প্রার্থীদেরও গ্রেফতার করার হুমকি দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে প্রার্থী ও সমর্থকরা গ্রেফতার আতঙ্কে ভুগছেন।গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার প্রহলাদপুর ইউনিয়নে মঙ্গলবার রাতে নিজ দলের এক মেম্বার প্রার্থীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠছে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে। শ্রীপুর উপজেলার প্রহলাদপুর ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের মেম্বার প্রার্থী আক্তার হোসেনকে মঙ্গলবার রাতে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। বুধবার নাটোর সদরের হালসা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির নির্বাচনী অফিস ভাঙচুর করেছে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুস সাদেক প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে বলেছেন, কার ঠ্যাং ভাংবো আর কার হাত ভাংবো তা জানি না। সকাল ১১টার মধ্যে নৌকার প্রার্থীকে জয়ী করতে হবে। নইলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। মঙ্গলবার রায়পুরা উপজেলার মরজাল ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী সানজিদা খাতুন নাসিমার নৌকা প্রতীকের পক্ষে কর্মীসভায় প্রকাশ্যে তিনি এ ঘোষণা দেন।
গত মঙ্গলবার রাজবাড়ীর পাংশায় ইউপি নির্বাচনকে ঘিরে সরিষা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের কর্মীরা শতাধিক বাড়ি-ঘর ভাংচুর করে। এ সময় পুলিশের গুলিতে নারী ও একজন প্রতিবন্ধী গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছে তিনজন। গুলিবিদ্ধরা হলেন ইউনিয়নের বেছপাড়া গ্রামের প্রতিবন্ধী ভিক্ষুক মন্দির মোল্লা, খামারডাঙ্গা গ্রামের মোক্তার হোসেনের স্ত্রী মর্জিনা বেগম। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে সকাল ১০টার মধ্যে ভোটকেন্দ্র দখলে নিয়ে ভোটের বাক্স সিল মেরে নৌকা প্রতীকের অনুকূলে ফলাফল ঘোষণা দেয়ার হুমকি দিয়েছে আওয়ামী লীগের প্রার্থী। চুন্টা ইউনিয়ন পরিষদের স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী শেখ হাবিবুর রহমান লিখিত অভিযোগে বলেন, ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী শাহজাহান মিয়া ও তার লোকজন তাকে প্রাণনাশের হুমকিসহ নির্বাচনের দিন সকাল ১০টার মধ্যে লোপাড়া ভোটকেন্দ্র, চুন্টা হাইস্কুল কেন্দ্র, ঘাগড়াজুর প্রাইমারি স্কুলকেন্দ্র, রসুলপুর উত্তর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র জোরপূর্বক দখল করে নৌকা প্রতীকের অনুকূলে ফল ঘোষণা দেয়ার হুমকি দিয়েছেন। এ ব্যাপারে শেখ হাবিবুর রহমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও উপজেলা রিটার্নিং অফিসারের কাছে অভিযোগ দিয়েছেন। কিন্তু তারা কোন ব্যবস্থা নিচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। বুধবার রাতে লক্ষীপুরে সাবেক এমপি নাজিম উদ্দিন আহমেদের বাড়িতে আওয়ামী লীগের কর্মীরা হামলা চালায় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সন্ত্রাসীদের এলোপাতাড়ি গুলিতে তার বাড়ি ও গাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তাকে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। সিরজাগঞ্জ জেলা ওলামা দলের সাধারণ সম্পাদক ও ইউপি নির্বাচনের চেয়ারম্যান প্রার্থী হাফেজ এনামুলকে ৬ দিন আগে ব্যাংক থেকে বের হওয়ার পর অপহরণ করা হয়েছে। এখনো পর্যন্ত তার হদিস মিলেনি। তৃতীয় ধাপের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। বিএনপি প্রার্থী, এজেন্ট ও সমর্থকরা যেন নির্বাচনের দিন ভোট কেন্দ্রে না যায়, সেজন্য বাড়ি-বাড়ি গিয়ে হুমকি দিচ্ছে আওয়ামী সন্ত্রাসী ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন-এমন অভিযোগ বিএনপি প্রার্থীদের। নির্বাচনের দিন ভোট কেন্দ্রে গেলে হত্যা ও লাশ ফেলে দেয়ার হুমকি দেয়া হচ্ছে। নির্বাচনী বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি নেতা-কর্মীদের পুলিশ গণগ্রেপ্তার শুরু করছে বলেও অভিযোগ বিএনপির। বেশ কয়েকটি জেলায় বিএনপি প্রার্থী ও নেতা-কর্মীদের বাড়িতে হামলা, গুলিবর্ষণ ও ভাঙচুর চালিয়েছে আওয়ামী লীগের কর্মীরা বলে অভিযোগ উঠেছে। বিএনপির পক্ষ থেকে করা অভিযোগে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের লোকদের ভয়ঙ্কর তা-বে গ্রামীণ জনপদ বিরাণ ভূমিতে পরিণত হয়েছে। ভোটাররা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। নির্বাচনে মানুষ ভোট দেয়া তো দূরে থাক, তারা প্রাণ নিয়ে এলাকায় থাকতে পারবেন কি-না সে আতঙ্কে নিদ্রাহীন রাত কাটাচ্ছেন। এদিকে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ বলেছেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে কোনো ধরনের অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা দেখতে চান না প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চলমান ইউপি নির্বাচনে যাতে কোনো ধরনের অনিয়ম না হয় সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা নিয়ে ইসিতে এসেছিলেন আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধি দল। বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ এর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল নির্বাচন কমিশনে গেছেন। প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেছেন নির্বাচন কমিশনার শাহনেওয়াজ। নির্বাচন কমিশনার বলেন, আগের দুই ধাপ থেকে কমিশন যথেষ্ট শিক্ষা নিয়েছে। সামনের ধাপগুলোতে ভুল কম হবে। আশা করি, সন্ত্রাস-সহিংসতা হবে না, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে। প্রধানমন্ত্রী ও নির্বাচন কমিশনারের এ বক্তব্যকে নিছক আই-ওয়াশ বলে অভিহিত করেছেন পর্যবেক্ষকরা। তারা বলেছেন, অতীতের মত কেবল আশ্বাসের বাণী দিয়েই জনগণকে  আশ্বস্ত করতে চান তারা।

সুত্র : শীর্ষ নিউজ ।
Labels:

Post a Comment

Contact Form

Name

Email *

Message *

Powered by Blogger.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget