সাড়ে ৪ হাজার নতুন বাংলা পরিভাষা

আবু সালেহ রনি
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
  • ৯৭ বার পঠিত

দেশের অধস্তন আদালতের বিচারকাজে বাংলা ভাষা ব্যবহার হলেও উচ্চ আদালতে হয় না বললেই চলে। ইংরেজি শব্দের বাংলা পরিভাষা না থাকায় উচ্চ আদালতের বিচারপতিরা বাংলায় রায় এবং আদেশ দিতেও তেমন আগ্রহী নন। সুপ্রিম কোর্টের কয়েকজন বিচারপতি বাংলায় রায় ও আদেশ দিলেও তাদের সংখ্যা বেশি নয়।
এমন প্রেক্ষাপটে ইংরেজি শব্দের বাংলা পরিভাষা প্রণয়নে জোর দিয়েছে বিচার বিভাগ ও সরকার। দীর্ঘ গবেষণার পর প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানসহ বিশেষজ্ঞ একটি দলের যৌথ উদ্যোগে ইংরেজি সাড়ে চার হাজার শব্দের নতুন বাংলা পরিভাষাও নির্ধারণ করেছে আইন কমিশন। সব মিলিয়ে আইন কমিশনের উদ্যোগে দশ হাজারেরও বেশি বাংলা পরিভাষা নিয়ে মুদ্রিত হয়েছে ‘আইন-শব্দকোষ।’
বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্দেশে উৎসর্গ করা হয়েছে আইন-শব্দকোষ। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে বাণিজ্যিকভাবেও এর বিপণন শুরু হয়েছে। একইভাবে ইংরেজিতে রায় ও আদেশ অনুবাদের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় তৈরি হয়েছে ‘বাংলা অ্যাপ’। এটি আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের উদ্যোগে উদ্বোধনের কথা রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘বাংলায় রায় ও আদেশ দেওয়াটা শুধু জরুরি নয়, অত্যাবশ্যক। কারণ দেশের নাগরিক বিশেষ করে, যারা গ্রামাঞ্চলে বসবাস করেন, তাদের করা মামলার রায় ও আদেশ মাতৃভাষায় হওয়া বাঞ্ছনীয়। তাছাড়া আমরা বহু আগেই ঔপনিবেশিক আমল পেরিয়ে এসেছি। তাই সেই মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসাও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয়। তাই সরকার উচ্চ আদালতসহ সর্বস্তরে বাংলা ব্যবহারে গুরুত্ব দিয়েছে।’ আইনমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও গত বছর এক অনুষ্ঠানে বাংলায় রায় দিতে বিচারকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। ইংরেজি রায়গুলো বাংলায় অনুবাদ করে বিচারপ্রার্থীদের কাছে পৌঁছে দিতে বলেছিলেন। এমন প্রেক্ষাপটে আইন কমিশনের তৈরি করা আইন-শব্দকোষ বিচার ব্যবস্থায় অনন্য ভূমিকা রাখবে বলে বিশ্বাস করি।
এ কাজে যারা যুক্ত ছিলেন তাদের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, বাংলায় রায় দেওয়া এবং ইংরেজি শব্দ অনুবাদের জন্য একটি ‘বাংলা অ্যাপ’ তৈরি করে সুপ্রিম কোর্টে পাঠিয়েছি। ১৮ ফেব্রুয়ারি এটি উদ্বোধন করা হবে। এর ফলে উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষায় রায় ও আদেশ দিতে যে সমস্যাগুলো রয়েছে, তা অনেকাংশেই থাকবে না।
পরে আইন-শব্দকোষ প্রণয়নের প্রেক্ষাপট জানতে চাইলে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক বলেন, ‘বাংলায় রায় দিতে গিয়ে আমার যে কষ্ট হয়েছে, আমি চাই সেই কষ্ট যাতে আর কারও না হয়। সে জন্যই এই আইন শব্দকোষ। আশা করছি- বিচারক ও আইনজীবী সবাই এতে উপকৃত হবেন। তারা বাংলায় রায় ও আদেশ দিতে উৎসাহী হবেন।’
তার মতে, বিচারকদের মানসিকতার কারণে উচ্চ আদালতে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি। তাদের সদিচ্ছা থাকলে অধস্তন আদালতের মতোই উচ্চ আদালতের সর্বত্র বাংলায় রায় ও আদেশ দেওয়া সম্ভব। প্রথমদিকে কিছু সমস্যার মুখোমুখি হলেও নিয়মিত বাংলায় রায় ও আদেশ দিতে থাকলে সেই সমস্যাগুলোর সমাধান বেরিয়ে আসবে।
প্রসঙ্গত, দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে ১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলা একাডেমিতে দেওয়া বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘আমাদের হাতে যেদিন ক্ষমতা আসবে, সেদিন থেকেই সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু হবে।’ এরই ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধুর সরকার সংবিধানে প্রজাতন্ত্রের ভাষা হিসেবে বাংলা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে। সংবিধানের এ বিধান যথাযথভাবে কার্যকর করতে ১৯৮৭ সালের ৮ মার্চ বাংলা ভাষা প্রচলন আইন করা হয়। এক দশক আগে আইন কমিশন থেকেও সরকারের কাছে এ ব্যাপারে সুপারিশ করা হয়েছিল। তবে এখনও উচ্চ আদালতে পূর্ণাঙ্গভাবে এই বিধান কার্যকর হয়নি।
২০১৫ সালে আইন কমিশন থেকে ইংরেজি পরিভাষার ভিত্তিতে আইন শব্দকোষ প্রণয়নে উদ্যোগ নেওয়া হয়। তখন দেখা যায়, ২০০৬ সালে কানাডা সরকারের অর্থায়নে প্রয়াত প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ও আনিসুজ্জামান একটি আইন শব্দকোষ প্রণয়ন করেছিলেন, যার কপিরাইট রয়েছে কানাডা তথা ইংল্যান্ডের রানী এলিজাবেথের কাছে। এ পর্যায়ে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে আইন কমিশন কানাডা সরকারের অনুমতির চেষ্টা করেন, যার ধারাবাহিকতায় চিরন্তন (স্থায়ী) অনুমতি পাওয়ার পর ২০১৬ সালে ‘আইন শব্দকোষ’ তৈরির কাজ শুরু করা হয়।
এ সংকলন প্রণয়ন ও সম্পাদনায় যুক্ত ছিলেন আইন কমিশনের চেয়ারম্যান এবিএম খায়রুল হক, প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর ও প্রয়াত ড. শাহ আলম। তাদের সহায়তা করেন বাংলা একাডেমির সাবেক পরিচালক প্রয়াত হাবিবুল আলম, সুব্রত বড়ূয়াসহ ২৫ জন। এক হাজার ৫৫৪ পৃষ্ঠার (নোটপাতাসহ) এই শব্দকোষের দাম দুই হাজার টাকা।
অতীত নজির :নব্বইয়ের দশক থেকে উচ্চ আদালতে বাংলার ব্যবহার নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। প্রয়াত সাবেক প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ও বিচারপতি এম আমীরুল ইসলাম চৌধুরী বাংলায় কয়েকটি আদেশ ও রায় দেন। কিন্তু তা আইন সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়নি। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত আইন সাময়িকীর (ঢাকা ল’ রিপোর্টস ৫০ ও ৫১ ডিএলআর) তথ্য অনুসারে, ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিচারপতি কাজী এবাদুল হক ও বিচারপতি হামিদুল হকের বেঞ্চ নজরুল ইসলাম বনাম রাষ্ট্র মামলায় বাংলায় রায় দেন। একই সময়ে বিচারপতি হামিদুল হক অন্য একটি ফৌজদারি রিভিশন মামলায়ও বাংলায় রায় দেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় সাবেক বিচারপতি আবদুল কুদ্দুছ, সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক, সাবেক বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী প্রমুখ বাংলায় বেশ কয়েকটি রায় দিয়েছেন।
বর্তমান অবস্থা : গত কয়েক বছর ধরে উচ্চ আদালতে বাংলায় রায় ও আদেশ দেওয়ার প্রবণতা বিচারপতিদের মধ্যে কিছুটা বেড়েছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে এর ব্যবহার দেখা যায়। অবশ্য হাইকোর্টের বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন নিয়মিত রায় ও আদেশ বাংলায় লিখে অনন্য দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছেন। তিনি এ পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজার রায় ও আদেশ বাংলায় দিয়েছেন। এরপরই আছেন বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল। তিনি দুই হাজারেরও বেশি রায় ও আদেশ দিয়েছেন বাংলা ভাষায়।
এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে আরও কয়েকজন বিচারপতি বাংলায় রায় ও আদেশ দিয়ে আলোচনায় আছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন- (জ্যেষ্ঠতা অনুসারে) আপিল বিভাগের বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী এবং হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম, বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ, বিচারপতি এএনএম বসির উল্লাহ, বিচারপতি আবু জাফর সিদ্দিকী, বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম, বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম, বিচারপতি আবু তাহের মো.সাইফুর রহমান, বিচারপতি মো. আতোয়ার রহমান, বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খান ও বিচারপতি মো. জাকির হোসেন। উচ্চ আদালতে বর্তমানে ১০২ জন বিচারপতি কর্মরত আছেন। বিশ্বের অনেক দেশের উচ্চ আদালতেই বর্তমানে মাতৃভাষায় বিচারকাজ চলে ও রায় দেওয়া হয়। যেগুলোর মধ্যে জাপান, জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন, নেদারল্যান্ডস অন্যতম।
পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মরত সুপ্রিম কোর্টের কয়েকজন বিচারপতি বলেন, বঙ্গবন্ধু যখন সর্বস্তরে বাংলা ব্যবহারের কথা বলেছিলেন, তখন থেকেই বাংলায় রায় দেওয়া হলে, বাংলায় ইংরেজির পরিভাষা ব্যবহার আরও গতিশীল হতো। এখনও যদি উচ্চ আদালতে ১০ জন বিচারপতি নিয়মিত বাংলায় রায় ও আদেশ দেওয়া শুরু করেন তাহলেও বাংলা পরিভাষা সৃষ্টি হবে। এতে ভিন্ন ভাষার পরিভাষা প্রয়োজন হবে না।
ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিকের মতে, ইংরেজিতে রায় দেওয়া একটা ঔপনিবেশিক মানসিকতা। বিচারক ও আইনজীবীরা পরিশ্রম করলে অনেক আগেই উচ্চ আদালতে সব মামলার রায় ও আদেশ বাংলা ভাষায় দেওয়া সম্ভব ছিল। তিনি বলেন, ‘নিম্ন আদালতে তো ঠিকই বাংলায় রায় ও আদেশ হচ্ছে।’
রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিচারকদের চিঠি :উচ্চ আদালতে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা কার্যকরে গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, আইনমন্ত্রী এবং উচ্চ আদালত ও অধস্তন আদালতের বিচারকসহ দুই হাজার ৯০ জনকে চিঠি ও মেইল পাঠিয়েছে বেসরকারি সংগঠন হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন। সংগঠনের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শফিকুর রহমানের পাঠানো এ চিঠিতে আদালতের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহারে সংবিধান ও আইনগত যুক্তিগুলো তুলে ধরা হয়েছে। তিনি এ বিষয়ে বলেন, ‘বাংলা ভাষায় রায় পাওয়া নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। এটিই চিঠিতে সংশ্নিষ্টদের কাছে তুলে ধরে উচ্চ আদালতের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা কার্যকরে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।’

সুত্র . দৈনিক সমকাল ।




নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..